কারিগরি শিক্ষার উন্নয়নে প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ

কারিগরি শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে বিশ্বের অনেক দেশ উন্নয়নের স্বর্ণশিখরে পৌঁছেছে। কিন্তু আমরা এই খাতকে এত দিন তেমন একটা গুরুত্ব না দিয়ে পিছিয়ে পড়েছি। আমাদের একটি বড় জনগোষ্ঠী দেশের বাইরে থাকলেও তারা দক্ষ না হওয়ায় খুব বেশি সুবিধা করতে পারছে না। যদি তারা দক্ষ হতো তাহলে আমাদের রেমিট্যান্সও দ্বিগুণ হতো। কিন্তু দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ করে তোলা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ। তাহলেই ২০৪১ সালে এই দেশকে উন্নত রাষ্ট্রে উন্নীত করা সম্ভব।

গতকাল মঙ্গলবার কালের কণ্ঠ ও টেকনিক্যাল এডুকেশন কনসোর্টিয়াম অব বাংলাদেশ (টেকবিডি) আয়োজিত ‘জাতীয় জীবনে কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। কালের কণ্ঠ কার্যালয়ে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

কালের কণ্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলনের সঞ্চালনায় এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন টেকবিডির জেনারেল সেক্রেটারি ড. মো. ইমরান চৌধুরী। আরো বক্তব্য দেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদরাসা বিভাগের সচিব মো. আলমগীর, কালের কণ্ঠ’র নির্বাহী সম্পাদক মোস্তফা কামাল, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অশোক কুমার বিশ্বাস, বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান, টেকবিডির প্রেসিডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল আজিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মালেক, ড্যাফোডিল গ্রুপের চেয়ারম্যান সবুর খান, বিকেএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি এ এইচ আসলাম সানি, বাংলাদেশ প্রাইভেট পলিটেকনিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিপিওএ) সাধারণ সম্পাদক মো. শামীম মাহবুব, মেট্রোসেম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শহীদ উল্লাহ, ফেয়ার গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. রুহুল আলম আল মাহবুব, ওয়ালটন-বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক এস এম জাহিদ হাসান, বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা কল্যাণ সমিতির সভাপতি মো. নাজমুল ইসলাম, স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদের (স্বাশিপ) সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ শাহজাহান আলম সাজু এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির (এনআইইটি) প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. আব্দুল আলিম।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘এই বৈঠকের মাধ্যমে কারিগরি শিক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একটা ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। বর্তমান যুগে শিক্ষা মানেই বাস্তব জীবনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ শিক্ষা। যে শিক্ষা বাস্তব জীবনে কাজে লাগে না সেই শিক্ষা কাজে আসবে না। আমরাও শিক্ষার্থীদের এ ধরনের শিক্ষা দিতে চাই না। ২০০৯ সালে কারিগরিতে শিক্ষার্থী ভর্তির হার ছিল মাত্র ১ শতাংশ। আমাদের সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় তা ১৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ২০২০ সালের মধ্যে এটা ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।’

মন্ত্রী বলেন, ‘যাঁরা বিনিয়োগকারী তাঁদের কাছ থেকে সুপারিশ ও পরামর্শ নিয়েই শিক্ষার্থীদের তৈরি করতে হবে। কারণ যাঁরা চাকরি দেবেন তাঁরা কোন ধরনের মানবশক্তি চান, সেটি জানা দরকার। দেশে ৪৫টি সরকারি পলিটেকনিকের পাশাপাশি কয়েক শ বেসরকারি পলিটেকনিক গড়ে উঠেছে। আমরা সাধ্যমতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহযোগিতা দেওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু আর্থিক সংকটে ভালোভাবে তা করতে পারছি না। সৃজনশীল কিছু করতে কারখানা বা শিল্পোদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করতে হবে।’

কালের কণ্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন বলেন, ‘প্রায় এক কোটি মানুষ বিদেশে কর্মরত। তাদের পাঠানো অর্থে আমাদের অর্থনীতি স্বনির্ভর হচ্ছে। কিন্তু যাদের আমরা বিদেশে পাঠাচ্ছি বা আমাদের দেশে যারা কলকারখানায় কাজ করছে তারা কতটুকু দক্ষ এই বিষয়গুলো পরিষ্কার হওয়া ও দিকনির্দেশনা থাকা উচিত। আমাদের এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে কারিগরি শিক্ষায় কতটুকু দক্ষ করতে পারছি সেটা ভাবা উচিত। উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরা কারিগরি শিক্ষায় যাচ্ছে না। এতে বেকারত্ব সৃষ্টি হচ্ছে। এ জন্য সবার মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।’

কালের কণ্ঠ’র নির্বাহী সম্পাদক মোস্তফা কামাল বলেন, ‘আমাদের দেশে কারিগরি শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। যারা বিদেশে যায় তাদের বেশির ভাগই অদক্ষ। তারা নেতৃত্ব পর্যায়েও যেতে পারে না। ফলে আমাদের দেশের অনেকে বিদেশে থাকলেও সেই তুলনায় রেমিট্যান্সের পরিমাণ কম। যদি আমরা দক্ষ জনগোষ্ঠী পাঠাতে পারতাম তাহলে রেমিট্যান্স অনেক বেড়ে যেত। কাজের উপযোগী করে কারিকুলাম তৈরিতে আমাদের এখনো সমস্যা আছে। এই জায়গাটায় আমাদের ঘাটতি রয়েছে। তাই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাটাকে ঢেলে সাজাতে হবে।’

কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আলমগীর বলেন, ‘২০২০ সালের মধ্যে কারিগরি শিক্ষার হার ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। এ জন্য বেসরকারি খাতকেও এগিয়ে আসতে হবে। আমরা বেসরকারি কারিগরি প্রতিষ্ঠানকেও নানাভাবে সহযোগিতা করছি। শিক্ষার্থীদের বৃত্তি, ল্যাব স্থাপন, শিক্ষকদের দেশ-বিদেশে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। আশা করছি সরকারি-বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগেই এগিয়ে যাবে কারিগরি শিক্ষা।’

টেকবিডির প্রেসিডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল আজিজ বলেন, ‘কারিগরি শিক্ষার উন্নয়ন সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সম্মিলিতভাবে এই খাতকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। প্রতিটি সাধারণ স্কুলেও অন্তত একটি করে ট্রেড চালু করতে হবে। এতে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের আগ্রহ তৈরি হবে। অন্যদিকে কেউ যদি মাধ্যমিকের পর পড়ালেখা নাও করতে পারে তাহলেও তারাও দক্ষতা অনুযায়ী শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে পারবে। আমরা এ খাতের উদ্যোক্তাদের নিয়ে একটি কনসোর্টিয়ামের যাত্রা শুরু করেছি। এই কনসোর্টিয়াম থেকে পিছিয়ে পড়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে। বিশেষ করে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও মান উন্নয়ন, ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোর লিংকেজ তৈরিসহ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।’